ভালোবাসার গল্প ।।লেখক;- রোকসানা রহমান।।

এটি একটি ভালোবাসার গল্প।। গল্পটি লিখেছে রোকসানা রহমান।

ভালোবাসার গল্প

বেশ কয়েকদিন ধরে আমি এক প্রাইভেট টিউটরের প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছি! তার কথা বলার ভঙ্গি,সাবলীল আলোচনা,মিষ্টি কন্ঠস্বরে আমি পুরাই দিওয়ানা। টিচারের প্রেমে ছাত্রীর হাডুবুডু খাওয়া নতুন ব্যাপার নয়। অস্বাভাবিকও নয়৷ স্বাভাবিক ব্যাপারের মধ্যেই ফেলা যায়। তবে আমারটা স্বাভাবিক নয়৷ চেপে-চুপেও ফেলতে পারছি না। কেননা,আমার মাস্টার মশাই আমাকে পড়াতে তো আসেন তবে সামনা সামনি নয়। ফোনের মাধ্যমে। এখন অনেকেই হয় তো ভাবছেন এটা আর তেমন কী! হয় তো তিনি দূরে থাকেন কিংবা ব্যস্ত থাকেন। তাই ফোনের মাধ্যমেই কাজ চালিয়ে নেন। ব্যাপারটা এমন হলেও মানা যেত। কিন্তু তাও নয়৷ কেননা,সে আমাকে ঠিক তখন কল দেয় যখন আমি ঘুমিয়ে পড়ি। মাঝরাতে!

কী ভাবছেন? তার মতলব খারাপ? উদ্দেশ্য খারাপ? তাহলে বলব উঁহু সে আজ অবধি একটি বাজে বাক্যও ব্যবহার করেনি। এমনকি আমি কে? কোথায় থাকি? কিসে পড়ি? বয়স কত? দেখতে কেমন? এই ধরনের কথাবার্তাতেও যান না। তাহলে কী বলেন? কী পড়ান? নিশ্চয় জানতে ইচ্ছে হচ্ছে? তাহলে শুনুন। এক রাতের ঘটনা বলি,

ভালোবাসার গল্প
ভালোবাসার গল্প

আমি প্রতিদিনের মতো সেদিনও রাত দুইটা পর্যন্ত মেসেন্জারে ফ্রেন্ডের সাথে আড্ডা দিয়ে ঘুমোতে গেলাম। আমার সকল খারাপ অভ্যাসের মধ্যে একটি ভালো অভ্যাস হলো-আমি বালিশে মাথা রেখে চোখ বন্ধ করলেই ঘুমিয়ে পড়ি। সেদিনও তাই হলো। ঘুম গাঢ় হতে গাঢ়তর হতেই এক পুরুষ কন্ঠ ভেসে এল কানে। গম্ভীর তবে স্নেহভর্তি সুরে বললেন,

“বীজ গণিত করবে নাকি পাটি গণিত?”

আমি চমকে উঠলাম। কিছুক্ষণ থম মেরে তার দিকে চেয়ে রইলাম। তবে আশ্চর্য! তার মুখ অবয়ব ঝাপসা। নাক,মুখ,চোখ কিছুই পরিষ্কার নয়। তবুও সেই ঝাপসা চেহারার দিকেই এক দৃষ্টিতে চেয়ে আছি। উনি ও সঙ্গে সঙ্গে কিছু বললেন না। মুহূর্তকাল নিরব থেকে বললেন,

“১৩১ পৃষ্ঠা বের কর।”

আমি বাধ্য মেয়ের মতো বই খুললাম। কিন্তু একি! বইয়ে সব সংখ্যার পৃষ্ঠার আছে কিন্তু ১৩১ নং পৃষ্ঠাটি নেই। আমি তন্ন তন্ন করে খুঁজছি। বইয়ের শুরু থেকে শেষ আবার শেষ থেকে শুরু। না কোথাও নেই। কোথায় গেল? মনে প্রশ্ন ছুঁড়তে উনি সরল গলায় বললেন,

“ছিড়ে ফেলেছো?”

আমি মুখটাকে দুঃখী বানিয়ে চুপ করে রইলাম। তৎক্ষনাৎ উনি গড়গড় করে অঙ্ক কষা শুরু করে দিলেন। খাতা কলমে নয়,মুখে মুখে। আমার বিস্ময় দৃষ্টি তার অনর্গল নড়তে থাকা ঠোঁট দুটিতে। কী বোকা আমি! কিছুই দেখতে পারছি না তবুও তাকিয়ে আছি। এক সময় উনি বললেন,

“বুঝেছো?”

আমি বললাম,

“কী?”

উনি আমার উত্তর না দিয়ে বললেন,

“এবার ঘুমাও। কাল আবার পড়াতে আসব।”

বলা শেষ হতেই পুরুষ উপস্থিত গায়েব হয়ে গেল। আমি স্যার স্যার বলে চেঁচাতে লাগলাম। এক পর্যায়ে আমার ঘুম ভেঙে গেল। হুড়মুড়িয়ে উঠে বসলাম। লাল ড্রিম আলোতে ফোন খুঁজতে শুরু করলাম। একি! ফোন তো আমার কানে নেই। এক হাত দূরে চার্জে লাগানো। তাহলে আমি কথা বললাম কিভাবে?

আরো পড়ুনঃ-

কী বুঝে গিয়েছেন? ধরে ফেলেছেন? জ্বি,আমার প্রাইভেট টিউটর আমার স্বপ্নে আসে। একবার,দুবার নয়। রোজ আসে। রোজ কল করে। একদিন গণিত তো একদিন ইংলিশ,পরের দিন হিসাববিজ্ঞান তার পরের দিন অন্য বিষয় পড়ায়। কী লজ্জা! বাংলাও পড়ায়। এবার আপনারাই বলুন,এমন বিনে পয়সায় এত সুন্দর করে আকাশ সমান ধৈর্য্য নিয়ে মুখে মুখে পড়িয়ে যাওয়া শিক্ষকের প্রেমে পড়াটা কি অন্যায়? হলে হোক তবুও আমি তার প্রেমে পড়ব। বার বার,বহু বার,অসংখ্য বার!

এই খুশি খুশি প্রেম আমার কয়েকদিনের ব্যবধানে নীল দুঃখে পরিণত হল। আমি এস এস সি পরীক্ষায় পাশ করে গেছি। কী ভ্রূজোড়া কুঁচকে গেল তো? নিশ্চয় ভাবছেন পাশ করলে তো খুশিতে মিষ্টি বিলানো উচিত তা না করে দুঃখ পাচ্ছি কেন? এর ও এক বিশাল ইতিহাস আছে। সংক্ষিপ্তে বলছি,

তিন বছর আগের কথা। আমি তখন দশম শ্রেণীতে পড়ি। টেস্ট শেষ। দুই মাস পড় বোর্ড পরীক্ষা। এর মধ্যেই বাবা আমার বিয়ে ঠিক করে ফেলেছেন। মা বাবার সাথে যুদ্ধ বাধিয়ে দিলেন৷ তার ইচ্ছে আমার আরো পড়তে হবে।ডাক্তার,ইন্জিনিয়ার,পাইলট কিছু একটা হতে হবে তারপর বিয়ে। এখন কোনো বিয়ে টিয়ে হবে না। তাদের ঝগড়াতে আমার কোনো আগ্রহ ছিল না। বিয়ে নিয়েও না এমন কি পরীক্ষা নিয়েও না। তবে আগ্রহ বাঁধলো এক সপ্তাহ পর। মা বাবার তুমুল যুদ্ধে মা হেরে গিয়েছেন। বাবা দাম্ভিকতা প্রকাশ করতে পাত্রপক্ষকে দাওয়াত দিলেন বাড়িতে। নিয়মানুসারে আমাকে দেখানো হল। আমিও কম কিসের? ঘোমটার নিচ থেকে লাজুক দৃষ্টি ছুড়লাম সোফা দখলকারীদের দিকে। দুজন পুরুষ ও একজন মহিলা। মহিলাটি সম্ভবত পাত্রের মা। তার পাশের জন কে বুঝতে পারলাম না। তার পাশের জনের দিকে তাকাতে বুঝলাম ইনি পাত্রের বাবা। তবে কি মাঝের লোকটি পাত্র! ঠোঁটের উপর মোটা গোঁফ দেখেই আমার জ্ঞান হারানোর প্রথম পর্ব শুরু হল। গোঁফ ছেড়ে মাথায় তাকাতে আমার হাত থেকে নাস্তা সাজানো ট্রে পড়ে গেল। মাথায় চাঁদ নিয়ে ঘোরা লোকটি আমার বর হবে? অসম্ভব! এবার বাবার সাথে আমার ঝগড়া শুরু হল। আমিও প্রায় হেরে বসে যখন পৃথিবীর সর্ব দুঃখীনির পদবী গ্রহণ করব তখনি পাত্রের বাড়ি থেকে মেসেজ এল। এখন বিয়ে হবে না। এস এস সির পর হবে। খানিকটা আশার আলো পড়ল চোখে। তখনি মাথায় বদবুদ্ধি চাপে। কেন জানি অনুমানশক্তি বলছিল, পরীক্ষায় ফেল করলে বিয়ে হবে না। সেই ধারণা নিয়েই পরীক্ষায় সাদা খাতা জমা দিলাম। অবাক কান্ড! যা ভেবেছিলাম তাই। ছেলে বাড়ি থেকে দ্বিতীয় বার্তা এল। রেজাল্ট দেখে বিয়ে হবে। এবার তো আমি মহাখুশি! আমি নিশ্চিন্তে দিন পার করছি রেজাল্টের। সময় শেষে ফলাফল প্রকাশ পেতেই তৃতীয় বার্তা এল। তাদের পুত্রবধূকে অবশ্যই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে। দরকার হলে আরো এক বছর অপেক্ষা করবে। আমি তখন খুশিতে উথালপাতাল! এই ছেলেকে বিয়ে করার চেয়ে হাজার বার ফেল করাও উত্তম। সেই থেকে আমি বই ছোঁয়া বন্ধ করে দিলাম। খাতা,কলম এদিক সেদিক ছড়িয়ে দিলাম। বাবার তখন মাথায় হাত! দিন রাত শুধু একটিই কাজ কী করে আমাকে পড়ানো যায়। কিন্তু তিনি কি জানেন না? ছাত্রী যদি নিজেই ফেল করতে চায় শিক্ষক চাইলেও পাশ করাতে পারেন না।

আরো পড়ুনঃ-

এখন নিশ্চয় ভাবছেন আমি পাশ করলাম কিভাবে? লিখেছি বলেই তো করেছি। এতোই যদি ফেল করার অধ্যবসায় তাহলে লিখলাম কেন? কী করব বলুন! তাহলে শুনুন,এবার আমার তৃতীয় বারের পরীক্ষা ছিল। বরাবরের মতো এবারও হলে আমি চিন্তাশূন্যই ছিলাম। নিরুদ্বেগে খাতায় নাম,রোল,রেজিষ্ট্রেশন নাম্বার টুকলাম। তারপর কলম দূরে রেখে ঘুম দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। তখনি গার্ড শিক্ষক এসে প্রশ্ন দিয়ে গেলেন। প্রশ্নে চোখ পড়তেই দেখি আমি সব পারি! কী করে? আমি তো পড়িনি। ভাবনায় ভাবনায় এক ঘন্টা চলে গেল। খাতা জমা দেব দেব ভাবতেই বুকটা ভারাক্রান্ত হয়ে গেল। মনে পড়ল আমার স্বপ্নে আসা ঝাপসা শিক্ষকের মুখটি! মুহূর্তেই আমি আমার সব অধ্যবসায় ভুলে গেলাম। গটগট করে সাদা খাতা কালো কালিতে ভরে ফেললাম। ফলস্বরূপ তৃতীয় প্রচেষ্টায় আমি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ। এখন যে আমায় বিয়ের পিড়িতে বসতে হবে! আমি দিনরাত আধার করে কান্নায় ডুবে আছি। আর মায়ের পিছ পিছ ঘুরে বলছি,

“আমি ডাক্তার হব, আম্মু। ইন্জিনিয়ার হব। পাইলট হব।ব্যাংকার হব। এখন বিয়ে দিও না। আমার তো আরো পড়তে হবে।”

আম্মু ছেৎ করে উঠেন। ঝাড়ু তুলে বলেন,

“তিনবারে মেট্রিক পাশ করে ডাক্তার হবি? ইন্জিনিয়ার হবি? ব্যাংকার হবি? তোর কি মনে হয়,তোর মতো সারা মানবগুষ্ঠির মাথায় গোবরে ভর্তি?”

আমি তখন হু হু করে কেঁদে উঠি। স্বপ্নে স্বপ্নে আমার স্বপন পুরুষকে খুঁজি। হায়! সে তো আর আসে না। এখন আমার কী হবে? মনে একজনকে রেখে আরেকজনকে কী করে বিয়ে করি? ধোঁকা! আমি খাব নাকি তাকে খাওয়াব বুঝতে পারছি না। শেষ বেলায় এসে স্বপ্নে স্বপ্নে ঝাপসা পুরুষের প্রেমে পড়লাম?

আমার দুঃখ কেউ বুঝল না। কেউ শুনল না। মনে পাথর ছুঁড়ে বিয়ের পিড়িতে বসলাম। কবুল বলে শ্বশুড়বাড়িও হাজির হলাম। এই মুহূর্তে আমি আমার বরের রুমে আছি। খাটের মাঝখানে চুপটি করে বসে দুঃখবিলাস করছি। দুঃখটা ঠিক কিসের জন্য? চাঁদ নিয়ে ঘোরা স্বামীর সাথে বাকি জীবন কাটাতে হবে সেজন্য নাকি কয়েকদিনের প্রাপ্তি প্রেমের ফুল পাপড়ি ছড়ানোর পূর্বেই ঝরে পড়ার জন্য? নাকি দুটোই! নাকের পানি,চোখের পানি এক সাগরে পড়তে আমার স্বামী রুমে এলেন। দরজায় খিল লাগিয়ে আমার পাশে বসলেন। ঘোমটা তুলতেই আমি গগন কাঁপিয়ে চিৎকার তুললাম,

“আপনি কে? ও মা গো,আমার সব কেড়ে নিতে এসেছে। বাঁচাও! স্বামী তুমি কই?”

আমি পালানোর জন্য খাট থেকে নেমে দৌড় দিব তার আগেই উনি আমায় ধরে ফেললেন। আমি আকুতি নিয়ে কিছু বলব তার মধ্যেই সজোরে তিনটে চড় বসালেন। আমি দমে গেলাম। অশ্রুসিক্ত নয়নে তার দিকে তাকালাম। অস্পষ্টসুরে বললাম,

“মারলেন কেন?”

উনি বোধ হয় আমার প্রশ্ন শুনলেন না। বললেন,

“চোখ মুছো।”

আমি মুচলাম না। কপট রাগ নিয়ে বললাম,

“মুছব না।”

আমি ভেবেই নিলাম আরেকটা চড় বসাবেন। কিন্তু না মারলেন না৷ বরঞ্চ নিজ হস্তে আমার চোখের জল মুছে দিলেন। বললেন,

“পুরো তিন বছর অপেক্ষা করিয়েছো। শুধু কি অপেক্ষা? তিনমাস নাইট ডিউটি করিয়েছো। তার তুলনায় তিনটা থাপ্পড় কিছুই না।”
“অপেক্ষা? আমি কেন অপেক্ষা করাব? আমি তো আপনাকে চিনিই না। কে আপনি? আবার নাইট ডিউটি কোথা থেকে আসল? আমি তো কোনো কোম্পানি খুলিনি!”
“খুলেছো তো। গোবর পরিষ্কার করার কোম্পানি। যার একমাত্র কর্মচারী আমি।”
“মানে?”
“মাথা থেকে বদবুদ্ধির জায়গায় পড়া বসাতে হয়েছে।”
“পড়া?”

আমার প্রশ্নের উত্তরে উনি জবাব দিলেন না৷ মিটিমিটি হাসলেন। আমি বিস্ময় নিয়ে বললাম,

“তার মানে আমি স্বপ্নে নয়,সত্যি সত্যি পড়েছি?”
“জি।”
“কিভাবে সম্ভব? আমি তো ঘুমাতাম।
“ঘুমের ঘোরে যদি খাওয়া সম্ভব হয় তাহলে পড়াও সম্ভব। তুমি তো শুধু খাও না ঘুমের ঘোরে কথাও বলো। জানো তো?”

আমি মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলতে উনি আবার বললেন,

“তোমার বাবার মুখে আমি সব শুনেছি। তুমি যে ইচ্ছে করেই ফেল করছো তাও বুঝতে পেরেছিলাম। তাই অন্য উপায় খুঁজতে হয়েছে।”
“কিন্তু আমি তো প্রতিবারই ঘুম থেকে উঠে দেখতাম ফোন চার্জে। তাহলে আপনার সাথে কথা হতো কী করে?”
“ইয়ারফোনে। তোমার অনেকগুলো বদ অভ্যাসের মধ্যে এটিও একটি কানে ইয়ারফোন লাগিয়ে ঘুমানো।”

আমি একি সাথে বিস্মিত ও আনন্দিত। তাহলে আমার প্রেমের ফুল ঝরেনি! আমার অলৌকিক ভালোবাসা লৌকিকে রূপ নিয়েছে? ইনিই আমার সেই স্বপ্নের প্রাইভেট টিউটর? আনন্দে আপ্লুত হতে হতে মনে পড়ল আমার তো অন্য কোথাও বিয়ে হয়েছে। তাহলে ইনি এখানে কেন? মনের প্রশ্ন মনে দাবিয়ে না রেখে প্রকাশ করলাম,

“আমার বিয়ে তো অন্য কারো সাথে হয়েছে। আপনি এখানে কেন? আমার স্বামী কোথায়?”

এবার উনার ভ্রূজোড়া কুঁচকে গেল। বিরক্ত নিয়ে বললেন,

“কার সাথে বিয়ে হচ্ছে না দেখেই বিয়ে করে নিয়েছো?”
“বার বার দেখার কী আছে? একবারতো দেখেছি।”
“কবে?”
“যেদিন আমাকে দেখতে এসেছিল।”
“সেদিন তো আমি আসিনি।”
“তাহলে আমি কাকে দেখলাম? মোটা গোঁফওয়ালাটা কে? যার অর্ধেক মাথা ফাঁকা?”

উনি কিছুক্ষণ থম মেরে রইলেন। এক সময় অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে বললেন,

“উনি আমার ছোট কাকা!”

লজ্জায় আমি মাথা নামিয়ে ফেললাম। ছি! কাকা শ্বশুড়কে হবু বর ভেবে কী কান্ডাটাই না করে বসেছি। লজ্জা শেষে আবার সুধালাম,

“আপনি এতটা নিশ্চিত কী করে হলেন যে আমাকে ঘুমের ঘোরে পড়িয়ে পাশ করিয়ে ফেলবেন।”

উনি সাথে সাথে উত্তর দিলেন না। খাটে বসলেন। বালিশ টেনে আধশোয়া হলেন। ধীরে ধীরে বললেন,

“নিশ্চিত ছিলাম না। ছোট্ট প্রচেষ্টা ছিল। শূন্য হাতে বসে থাকার চেয়ে চেষ্টা করাটা শ্রেয়!”

আমি এবার মুখ বাকিয়ে বললাম,

“আমাকে যদি এতই পছন্দ তাহলে অপেক্ষা করার কী দরকার ছিল? বিয়ে করে নিলেই পারতেন।”

উনি আমার দিকে কাত হলেন। সগর্বে বললেন,

“একজন শিক্ষকের স্ত্রী মেট্রিক ফেল! আমার প্রেস্টিজতো মাটিতে লুটোপুটি খেত।”
“আপনি শিক্ষক?”
“এতদিনেও বুঝতে পারো নি?”

আমি কিছুক্ষণ চুপ থাকলাম। উনার গর্বে উজ্জ্বল মুখ দেখে আমার হিংসে হতে লাগল। তাই গর্ব ভাঙতে বললাম,

“একজন শিক্ষক হয়ে অপ্রাপ্ত মেয়েকে বিয়ে করেছেন। আপনার লজ্জা হচ্ছে না?”

উনার মুখের ভঙ্গি একটুও বদলাল না। সরল গলায় বললেন,

“তখন আমি হবু শিক্ষক ছিলাম। তাই লজ্জা হওয়ার কথা নয়। এক বছর হল আমি শিক্ষকের পদবী পেয়েছি। এখন লজ্জা হত যদি তুমি অপ্রাপ্ত বয়সী হতে। কিন্তু তা তো নও। দুদিন আগেই তোমার আঠারো পূর্ণ হয়েছে।”

আমি আর কথা বাড়ালাম না। ক্লান্ত মনে খাটে বসতে গেলাম। অমনি উনি ধমকে উঠলেন,

“একদম বসবে না।”
“কেন?”
“তোমার শাস্তি শেষ হয়নি।”
“শাস্তি?”
“হুম।”

উনি খাট ছাড়লেন। কোনায় থাকা টেবিল থেকে একটা ইংলিশ বই নিয়ে আসলেন। আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন,

“এটার সূচনার পৃষ্ঠা থেকে সমাপ্তি পৃষ্ঠা রিডিং পড়বে। তারপর ঘুমাবে। তোমার বুঝা উচিত একা একা বকবক করতে কেমন লাগে,তাও বই পড়া!”

সমাপ্ত

রোমান্টিক ভালোবাসার গল্প

রাতের মধ্যপ্রহর। প্রকৃতির নিয়মানুসারে এ সময় ঘুমের তলদেশে থাকার কথা। কিন্তু আমি প্রকৃতির নিয়ম ভেঙে এক বিধবা মহিলার বাড়ির সামনে ঘুরঘুর করছি। একা নই,সাথে আমার বাবাও আছেন। ঠিক কি কারণে এসেছি জানিনা। বাবা এসেছেন তাই আমাকেও আসতে হয়েছে। কেন এসেছেন তা জিজ্ঞেস করার সময়টুকু আমার মেলেনি। হলুদসন্ধ্যের কর্মব্যস্ততা ঠেলে রুমের দুয়ার টানবো তখনি বাবা দুয়ারের সামনে এসে দাড়ালেন। গম্ভীর গলায় বললেন,,

“” জারিফ, আমার সাথে আয় তো!””
“” কোথায়?””

আমার ছোট্ট প্রশ্নটা বাবা ইচ্ছে করেই এড়িয়ে গেলেন নাকি শুনতে পাননি আমি জানিনা। কিন্তু ২৫ বছরের দীর্ঘজীবনে বাবার আদেশ অমান্য করা হয়নি। কিছু বলেছেন আর আমি শুনিনি তাও হয়নি। এমন নয় যে আমি বাবাকে ভয় পাই,সম্মান করি। ভয়ের থেকে সম্মানের বিরাট পার্থক্য। সবাই সেটা আলাদা করতে পারেনা। আমি পারি। খুব ভালো করেই পারি।

~~~

প্রায় ৪৫ মিনিট ধরে টিনঘেরা ছোট বাড়িটির চারধার ধরে দুজন হাঁটছি। আমার ঘুম পাচ্ছে। মাঝেই মাঝেই নিভুসুরে হামিও টানছি। কিন্তু এখন অবধি বাবার মনে কি চলছে বুঝতে পারছিনা। তবে তিনি চিন্তিত! এতোটাই যে আমার ছোট্টহামির নিভুস্বরেও উনি বিরক্ত!!

কোথায় এসেছি তাও জানিনা। তবে তিন/চারঘন্টা জার্নি শেষে ট্যাম্পুতে চড়েছি আরো আধঘন্টা। ঘুমে ঢুলার ফলে বাবার সাথে কোনো কথাও হয়নি। তবে ভাঙাভাঙা ঘুমের মাঝেও বাবার আর ট্যাম্পুচালকের আধোবুলি শুনেছি। সেখান থেকে বুঝতে পেরেছি আমরা যার সাথে দেখা করতে এসেছি তিনি কিছুদিন আগেই মারা গিয়েছেন। তাহলে আমরা ফিরে যাচ্ছিনা কেন এই প্রশ্নটাও করা হলোনা। আমি আমার ঘুমেই মগ্ন হলাম।

হামির সাথে তাল মিলিয়ে ছোট্ট ভাবনায় ডুব দিতেই হাতে টান খেলাম। বাবা হাতে ধরে টানছেন। কিছুটা অবাক হয়ে উনার দিকে তাকালাম। উনি আচমকা বাশের বেড়া টেনে খুললেন। আমাকে আরেকদফা অবাক করে বন্ধ দরজায় কড়া নাড়লেন। রাতের প্রায় শেষ প্রহর। এ সময় সাধারণত ঘুমের মানুষরা মনোযোগী স্বপ্নখোর থাকে। ঘুমটা বেশিই গভীর থাকে বিধায় একডাকে কেউ সজাগ হয়না। হলেও আলসেমী ভাব নিয়ে এপাশওপাশ করে। দ্বিতীয় ডাকে উঠে। কিন্তু আমার ভাবনাকে ভুল করে দিয়ে বাবার প্রথম কড়াতে দরজা খুলে গেলো। এক ভদ্রমহিলা দরজাটা কিঞ্চিত ফাঁক করলেন। উনাকে প্রশ্ন করতে হয়নি,বাবা নিজেই প্রশ্নছাড়া উত্তর দিলেন,,

“” আমি জালাল সিকদার। ঢাকা থেকে আসছি। আপনার সাথে একটু দরকার ছিলো। আপনি হয়তো আমাকে চিনবেন…

ভদ্র মহিলা ছো মেরে বাবার কথা টেনে নিয়ে বললেন,,

“” চিনতে পেরেছি!

ভদ্রমহিলা সুর ছেড়ে মাথায় ঘোমটা টানলেন,দুয়ারের বন্ধ-খোলার ফাঁকটা সামান্য বড় করে বললেন,,

“”উনার মুখে আপনার গল্প শুনেছি!””

আমি শুধু গল্প শুনেছিটুকু শুনেছি তারপর আর কিছু শুনতে পেলামনা। আমার কর্ণদ্বয় কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছি কি? নাতো,সেতো ঠিক তার মৌলিক কাজটা করছে, ওটা কার নিশ্বাসের শব্দ পাচ্ছি আমি? আশেপাশে তো বাবা আর এই ৪০ বছরের মহিলা ব্যতীত কেউ নেই!

কানটা আরেকটু খাড়া করলাম। পৃথিবীর সকল শব্দকে ধামাচাপা দিতে ইচ্ছে করছে। এক অচেনা নিশ্বাসের শব্দে আমার বুকে উথাল-পাতাল ঢেউ। একঅস্থির উত্তেজনায় আমি ছটফট করছি। নাহ! আর পারছিনা। আমার অচেনা নিশ্বাসের চেনা মানবীটাকে চাই। আচ্ছা আমি মানবী শব্দটা ব্যবহার করলাম কেন? আমি কাউকে না দেখেই শুধু নিশ্বাসের শব্দকে উপলক্ষ করে লিঙ্গাচারণ করে ফেললাম? এমন কি হতে পারেনা এটা কোনো মানবের নিশ্বাসের শব্দ? মানব-মানবী যাইহোক না কেন আমার নিশ্বাসধারীর দেখা চাই। চক্ষুদর্শনে বুকের ঢেউ থামাতে হবে। নাহলে যে আমার একুল-ওকুল সব ভেঙে কুরকুর! আমি আর ধৈর্য্য ধরতে পারলামনা। মনের তৃষ্ণা মুখে ফুটিয়ে বললাম,,

“” একটু পানি খাওয়াবেন?””

বাবা আর ভদ্রমহিলাটি হয়তো জরুরী কথপকথন করছিলেন। নাহলে পানি চাওয়াতে কারো এতো বিরক্ত হওয়ার কথা না। মায়ের মুখে সবসময় শুনেছি,শত্রুও যদি পানি খেতে চায়,তাহলে তাকে পানি দিতে হয়। আমি তো কোনো শত্রু নই,তাহলে? কি এমন জরুরী কথা? আমার শরীরটাতো বাবার সাথে লাগোয়া অবস্থাতেই আছে তাও কেন কিছু শুনতে পেলামনা?? আমি স্মৃতিশক্তিতে জোরালোচাপ দিয়ে মহিলাটির দিকে তাকালাম। যদি কোনো শত্রু অথবা তার পরিচিত কেউ হয়। কিন্তু আমি তাকাতে তাকাতে মহিলার দাড়ানো জায়গাটি শূন্য। হয়তো পানি আনতে গিয়েছেন। জায়গাটি শূন্য হলেও আমার আশা শূন্য হয়নি। চোখের দৃষ্টি নিয়ন্ত্রণহীন। আটকা পড়েছে এক ঘুমন্তকন্যার দিকে।

এলোমেলোচুলগুলো অনেকটা শক্ত জটলাকার ধারণ করে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে ঘুমন্তমানবীর। কপালপার্শে বাচ্চাচুলগুলো ঘামে ভিজে ল্যাপ্টে,চোখের বন্ধপাতা কাঁপছে,চিকন সরু নাকের ভারী পাতাগুলো ফুলে ফুলে উঠছে। ঠোঁটগুলোও কাঁপছে। চোখের নিচে লম্বাকারে তরলঅশ্রু শুকিয়ে আছে চিবুক চিড়ে। মাঝে মাঝে নিশ্বাসের সাথে পুরো শরীর কাঁপুনি দিচ্ছে। পাতলা কাথাটা কি তার শীতকে বশে আনতে পারছেনা? কিন্তু এই কাঠফাঁটা চৈত্রের গরমে শীত কোথা থেকে আসলো?? তবে কি মেয়েটি ঘুমেরঘোরেও ক্রন্দনরত?

এ কেমন কষ্ট হচ্ছে আমার? এ কেমন বুকফাঁটা ব্যথা অনুভব করছি? এ কোন মায়ায় জর্জরিত হচ্ছি? কে ও? আমি তো ওকে চিনিনা,তবুও কেন ওর শুকনো মুখটার দিকে তাকাতেই আমার হৃদয় হা হাকারে ভরে যাচ্ছে? কিসের মিলবন্ধন আমাদের? টানছে আমাকে খুব করে টানছে। ইচ্ছে করছে এখনি ছুটে গিয়ে ওর শুকনো মুখটা আমার শূন্যবুকে পিষে নেই। এতে কি হবে? কি লাভ হবে? এমন অদ্ভুত ইচ্ছে কেন জাগছে? আমিতো কখনোই নারীআসক্তি ছিলাম না। তাহলে?

মনের ভেতরে চলা হাজারও প্রশ্নে আমার সবকিছু অগোছালো হতে লাগলো। বুকের তৃষ্ণাটাও ক্রমাগত বাড়ছে। অজানা অদ্ভুত তৃষ্ণায় কি আমার মরণ হবে? এক পলকে দেখা কোনো এক তন্দ্রাময়ী নারীর জন্য?

“” পানি!””

ভদ্রমহিলার হাতের গ্লাসটা একদম আমার চোখের সামনে। দুই কি তিন ইঞ্চি দুরে হবে। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে কয়েক হাজার,কোটি কোটি ইঞ্চি দুরত্বে। আমি পাগলের মতো পানির গ্লাসটা নিলাম। ঢকঢক করে সবটা পানি খাচ্ছি। তাড়াহুড়োই পানির সিংহভাগ ঠোঁটের কিনার বেয়ে নিচে পড়ে গেলো। হাতের গ্লাসটাসহিত বাবাকে বললাম,,

“” আমি বাড়ি যাবো,বাবা।””

বাবার দিক থেকে কোনো উত্তরের আশা না করে হাঁটা ধরেছি। পেছনে বাবা আসছেন কি আসছেননা জানিনা। কিন্তু আমি ঠিক ততটাই দুরত্বে যেতে চাই যতটা দুরত্বে থাকলে তন্দ্রাময়ীর নিশ্বাসের শব্দ শুনতে পারবোনা।

আনমনে অনেকটা দুরে চলে এসেছি। চারপাশ নির্জন। মাঝে মাঝে রাস্তা ধরে দু/একটা সরল গাছ যা আকাশ ছুতে চাচ্ছে। আমি কান খাড়া করে আছি সেই মায়ার শব্দ শোনার জন্য।

“” মনুষ্যজাতি যখন ভালো সময় পার করে,তখন শুধু খারাপ অতীতকে নয় তখনকার ভালো মানুষগুলোকেও ভুলে যায়। বুঝলি?””

বাবার কন্ঠ পেয়ে ঘুরে দাড়ালাম। না পেছনে নয়,বাবা তো পাশে দাড়িয়ে সরলদৃষ্টি গভীর অন্ধকারে।

“” আমিও মানুষ তাই আমিও ভুলে গিয়েছি,আমার ছোটবেলা বন্ধু আকবরকে। আমার বাবা মানে তোর দাদা কঠিন মনের মানুষ ছিলেন। সাথে এক কথার মানুষ। যা বলতেন তাই করতেন। আর আমি সেই কঠিন মানুষের ছেলে হয়েও মনটা ছিলো নরম। জানিস তো,নরম মনের মানুষদের জীবনে প্রেম আসে খুব দ্রুত। আমারও এসেছিলো। তবে তা বাবার কাছে বলার মতো শক্ত মন থাকার প্রয়োজন ছিলো। সেটাতো আমার ছিলোনা। কি করে বলবো? তারমধ্যেই বাবা আমার বিয়ে ঠিক করলেন পরনারীর সাথে। একদিকে আমার বাবা অন্যদিকে তোর মা। কাকে রেখে কার কাছে যাবো? ঠিক তখনি আশার আলো হয়ে কাধে হাত রেখেছিলো আকবর। এমনি এক নীশিরাতে তোর মাকে নিয়ে পাড়ি দিলাম ঢাকা। তারপর? তারপর তোর মা,ক্যারিয়ার আর তোকে নিয়ে এতোটাই ব্যস্ত হয়ে গেলাম যে আকবরের কথা ভুলে গেলাম। আমার জীবনের সুখের কাঠিটা তো ওর জন্যই পেয়েছিলাম অথচ ওর কথাই ভুলে গেলাম? একটাবারও ভাবলাম না আমার হৃদয়হীন জন্মদাতার নির্মম নির্যাতনতো ওর উপরেই পড়বে। ক্লাসের টপার ছিলো ও অথচ মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করলো দিনমজুর হয়ে। আর আমি? টেনেটুনে পাস করা ছাত্র হয়েও আজ নাম করা ব্যারিস্টার। কি নেই আমার? গাড়ী আছে,বাড়ী আছে,চাকর-চাকরানী সব সব আছে আমার। সকাল হলেই তোকে বর সাজিয়ে রওনা দিবো স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বাড়িতে। তার একমাত্র মেয়েকে বাড়ির বউ করে নিয়ে আসবো। এতো সুখ,এতো পাওয়া তবুও আজ আমি অসুখী। আফসোসের ভারী বোঝা নিয়ে মৃত্যুপথের যাত্রী হবো।””

আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো বাবার কথা শুনছিলাম। কি বুঝলাম জানিনা। কিন্তু বাবার বুকের ব্যথার ক্ষতটা অনুভব করতে পারছি। গভীরত্বটা খুব বেশি। আসলেই মনুষ্যজাতিকে চেনা বড় দায়। চেনার কি উপায় আছে? ক্ষণে ক্ষণে যাদের মন পাল্টায়,চিন্তাশক্তি পাল্টায়, তাদের আমরা কি করে চিনবো? আবার আমরাই বোকার মতো বলে বেড়াই,পাঁচ বছর ধরে ওর সাথে থাকছি আমি ওকে চিনবোনা? আমার ছেলে,আমার রক্তকে আমি চিনবোনা? আসলেই কি আমরা তাকে চিনি? নাকি স্বভাবসুলভ কিছুদিনের,কিছুবছরের অভ্যাসকে চিনি? মানুষ চেনার শক্তিটা যদি আমাদের থাকতোই তাহলে পরিচিতি মানুষদের কাছ থেকে কখনোই কষ্ট পেতাম না। আমাদের কষ্টেরঝুড়িতে বহুলাংশটায় জমা পড়ে প্রিয় মানুষগুলোর থেকে।

আমার গাম্ভীর্য বাবা হঠাৎ করে অস্থির হয়ে পড়লেন।

“” এতো বড় ভুলটা আমি কি করে করলাম রে,জারিফ? আমি চাইলেই আকবরের জীবনটা অন্যরকম হতে পারতো। ওর মেয়ের একটা ভালো ঘরে বিয়ে হতে পারতো। আজ আমার জন্যই ওর সাথে সাথে আরো দুটো প্রাণ নিস্তেজ হয়ে যাবে। ঋণের বোঝা বয়তে না পেরে ঐটুকুন মেয়েকে একটা বুড়োকে বিয়ে করতে হবে। যার ঘরে এখনো আটখানা বউ।””

বাবার কথায় আমি স্তব্ধ। বিয়ে? কার বিয়ে? তন্দ্রাময়ীর? নাকি আমার বুকে বাজনা বাজানো ধুকপুকানির?

“” যার জন্য এলাম তার কিছুই হলোনা। আকবর যেমন তার বউটাও তেমন। এতো করে বুঝালাম কে শোনে কার কথা? আমি নাকি দয়া দেখাতে এসেছি। কৃতজ্ঞ পরিশোধ করতে এসেছি। আচ্ছা,বাপ তুই বল আকবরের মেয়ে মানে কি আমার মেয়ে না? আমার মেয়ের বিপদে কি আমি সাহায্য করতে পারিনা? আমি যদি ঋণের বোঝা নিজের ইচ্ছেতে নিজের কাধে নিতে পারি ওদের কি সমস্যা?””

আমি বাবার হাতগুলো নিজের হাতে নিলাম। ছোট্টহাসি দিয়ে বললাম,,

“” শুধু ঋণের বোঝা নিতে চাচ্ছো তো তাই রাগ করেছে। মেয়েকেটাও নেও তাহলে রাগ করবেনা।””
“” মানে?””

আমি আর বাবার চোখে চোখ রাখতে পারলামনা। পা দুটো ছুটিয়ে পিছন ফিরে বললাম,,

“” তোমার ছেলে তোমার ভুল শুধরিয়ে তার বউ আনতে যাচ্ছে। বরযাত্রী কাল নয় অনেক আগেই চলে এসেছে। এখন তো বউ উঠিয়ে নিবে!””

আমার কথায় বাবা হতভম্ব। হয়তো কল্পনাতেও এমনটা ভাবেননি। আমার বলা বাক্যগুলোর সহজ অর্থ বুঝে নিয়ে বললো,,

“” স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কি হবে? আমাকে অস্বাস্থ্য করে দিবে বাপ। ফিরে আয়।””

আমি পা থামিয়ে দাড়ালাম। বাবার দিকে ঘুরে দাড়িয়ে উচ্চস্বরে হেঁসে বললাম,,

“” যার জন্যে তোমার জীবনের সুখের কাঠি পেয়েছিলে আজ নাহয় তার মেয়ের জীবনে সেই সুখের কাঠিটা সমর্পণ করবে! তোমার খুশির জন্যই সেদিন বিয়ে করতে রাজী হয়েছিলাম আজও তোমার খুশির জন্যই কনে উঠাতে যাচ্ছি। সব তো তোমার জন্যই বাবা। নিজের খুশির জন্য এইটুকু করতে পারবেনা? ঠেলাটা সামলিয়ে উঠে আমাকে কল করো। ততক্ষণে তোমার ছেলের বউয়ের সাথে প্রেমালাপের পর্ব শেষ করে ফেলবো!””

আমি ছুটছি,প্রচন্ড বেগে ছুটছি। কেন ছুটছি? কার জন্য? কার সুখের জন্য জানিনা। শুধু জানি ঐ তন্দ্রাময়ীকে আমার চাই। নাহলে আমার জীবনঘড়ীর সবটুকু তন্দ্রা অন্ধকারে মিলিয়ে যাবে। সাথে আমার হৃদস্পন্দন!

তন্দ্রাময়ী (ছোটগল্প)

রোকসানা_রাহমান

Leave a Comment